প্রচ্ছদ » Slider » দুর্নীতির চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান সৃষ্টি

দুর্নীতির চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান সৃষ্টি

Posted By:নিজস্ব প্রতিবেদক | Posted In:Slider,মিডিয়া,মুক্ত মত | Posted On:Jan 26, 2019
media_press club

টুডেবার্তা ।।

প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন সেখানে প্রত্যাশামতই আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের বড় জয় ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের ভরাডুবির কারণ ব্যাখ্যা করেছেন তার মত করে। তবে তার ভাষণের দুটি কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। একটি বিষয় ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচিত আর সেটি হল দুর্নীতি।

প্রধানমন্ত্রী বললেন, তিনি দুর্নীতি নিয়ে সমাজের অস্বস্তি সম্পর্কে অবহিত আছেন। আর বলেছেন তার সরকারের সামনে সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, আগামী পাঁচ বছরে দেড় কোটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

 দেশের চেহারাটা বদলেছে। মানুষ একদিকে অনেক সচ্ছল হচ্ছে, আবার শ্রমের বাজারটা যেন খুলছেই না এই অবস্থার অবসানে বড় ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করে এগুতে হবে।

বেকারত্ব দূর করা, তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি ২০০৮-এর নির্বাচনের সময়ও ছিল। গত দুই মেয়াদে, অর্থাৎ দশ বছরে দেশ প্রশ্নাতীতভাবে এগিয়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, বড় অবকাঠামোখাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বড়ভাবেই দৃশ্যমান। এই উন্নয়নের বেদনাও মানুষকে সইতে হয়েছে এবং হচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে। কারণ প্রকল্প নির্মাণে বছরের পর বছর রাস্তাঘাট বেহাল হয়ে থেকেছে এবং থাকছে।

তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সেভাবে হয়েছে বলা যাবে না, যতটা প্রত্যাশিত ছিল। অনেকেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা স্বীকার করে বলেছেন, এই অগ্রগতি ছিল কর্মসংস্থানহীন।

রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ অবকাঠামো খাতে বড় গতিতেই ছিল। কিন্তু ব্যাক্তিখাতের বিনিয়োগে মরুভূমি থাকায় কর্মসংস্থান গতি পায়নি সেভাবে যেভাবে আশা করা গিয়েছিল। একবছর আগে, গত বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বেকারত্বের হার বাংলাদেশেই বেশি।

২০১০ সালের পর থেকে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা ও ভুটান এ হার কমিয়ে এনেছে। ভারতে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বেড়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে। এক বছরে পরিস্থিতি খুব বদলেছে বলা যাবে না। আমাদের আর্থিক বৃদ্ধির হার এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি, কিন্তু বেকারত্বের হারও বেশি। আমাদের পুরোনো উদ্যোক্তারা ব্যবসা করছেন, নতুন করে লগ্নি করতে আসছে খুব কম।

একদিকে জমির স্বল্পতা, অন্যদিকে অবকাঠামো খাতে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পরও তা কাজে লাগাতে পেরেছে খুব কম উদ্যোক্তা। প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা-ই সত্যি। দুর্নীতির দুষ্টচক্র বিদ্যুৎ, গ্যাসের সংযোগসহ একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে নানাভাবে হয়রানি করে হতাশ করে ছাড়ছে উদ্যোক্তাদের। কিছুদিন আগেই দেখা গেছে, কিভাবে তিতাস গ্যাসে কেজিতে এক হাজার টাকার নোট ঘুষ হিসেবে নেয়া হয়। এর বাইরে আছে ব্যাংক ঋণ, এর প্রাপ্যতা ও এর সুদের হারের প্রশ্ন।

দেশে একটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন শিল্প আসছে না। কৃষিতেও বৃদ্ধি হচ্ছে না। একমাত্র সচল তৈরি পোশাক খাত এবং সেখানেও শ্রমিক সংগঠনগুলির নানা মারমুখি আচরণে শংকার মধ্যেই থাকতে হয় বড় সময় ধরে। আশার জায়গা তথ্য প্রযুক্তি খাত এবং দেখার বিষয় এবার সেখান থেকে বড় প্রাপ্তি আসে কিনা।

অস্বস্তির জায়গা হলো শিক্ষিত বেকারত্ব। শিক্ষিত বেকারের হার ৪৭ শতাংশ। এত রাষ্ট্রীয় ও পারিবকারিক বিনিয়োগের পর একটি ছেলে বা মেয়ে বেকার থাকলে তা শুধু কষ্টদায়ক নয়, বরং বলতে হবে সম্পদের অপচয়।

গরিবরা বেকার হন না। দরিদ্রদের মধ্যে বেকার দেখা যায় না। বেকার সমস্যা বলে সচরাচর যাকে আমরা চিনি, তা আসলে যারা শিক্ষিত এবং তারাই আসলে কাজ পান না। বড়লোকদের বেকার হওয়ার সুযোগই নেই। ভাবনা মধ্যবিত্তকে নিয়ে, যাদের কাজের সুযোগ প্রসারিত হচ্ছেনা।

১৬ কোটিরও বেশি মানুষের দেশে উদ্যোক্তারা বলেন তারা চাকুরি প্রার্থী পান লাখ লাখ, কিন্তু সত্যিকারের কাজের লোক পান না। ভাল ভাবে বুঝতে হবে কেন বিভিন্ন ধরনের কাজে শ্রমের বাজারে চাহিদা আর জোগানে ফারাক হয়। কোথাও কাজের লোক পাওয়া যায় না আবার কিছু জায়গায় সবাই কাজের জন্য লাইন দেয়।

আমাদের কর্মসংস্থান জড়িত শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্মমূখী বিদ্যার গুরুত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। সবাইকে এমবিএ, বিবিএ, এমএ/এমএসসি এমনকি পিএইচ ডি করার এক বিশাল ‘সমাজতান্ত্রিক’ ভাবনা দেশটাকে কর্মসংস্থানহীন করে রেখেছে। কারিগরি শিক্ষাকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে কারণ সাবেকি শিক্ষার কাছে সে যেন অতি অস্পৃশ্য।

কারিগরি বিদ্যায় দক্ষ একজন বড় বেতনের কাজ পায়, তার কাজের অভাবও হয় না, কিন্তু তার কোন সামাজিক মর্যাদা নেই। আর এভাবেই আমরা বেকার তৈরি করছি, কাজ দিতে পারছিনা। শিক্ষিত বিশাল এক জনগোষ্ঠীর অকারণ অযোগ্য উচ্চাশা উচ্চারিত আকাশে বাতাশে।

পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টেছে। আত্মকর্মসংস্থানে ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া এ দেশের বেকার সমস্যা মিটবে না। সরকার যখন বেকারত্ব নিয়ে ভাবছে, তখন এই ভাবনাটা জরুরি। যেকোন সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি দিয়ে দেয়ার চাইতে বড় প্রয়োজন এরা সমাজের কোন কাজে লাগবে সেটা ভাবা।

দেশের চেহারাটা বদলেছে। মানুষ একদিকে অনেক সচ্ছল হচ্ছে, আবার শ্রমের বাজারটা যেন খুলছেই না এই অবস্থার অবসানে বড় ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করে এগুতে হবে। বেকার সমস্যা আসলে কেন হচ্ছে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ করা দরকার। সবাইকে অমুক বিষয়ে মাস্টার্স করিয়ে শিক্ষিত বেকারের জোগান বাড়াব, নাকি কারিগরি কাজের সম্মান বাড়াব সেই ফয়সালাটা হোক দ্রুততার সাথে।

।। সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা- প্রধান সম্পাদাক, জিটিভি ।।

সূত্র : জাগোনিউজ২৪.কম

সূত্র : জাগোনিউজ২৪.কম