প্রচ্ছদ » Slider » বাংলাদেশ হবে বিশ্বের উন্নত ও ধনী রাষ্ট্র 

বাংলাদেশ হবে বিশ্বের উন্নত ও ধনী রাষ্ট্র 

Posted By:নিজস্ব প্রতিবেদক | Posted In:Slider,মুক্ত মত | Posted On:Jun 15, 2015

ড. সুফি সাগর সামস্

৬ জুন (২০১৫) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দু’দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বাংলাদেশ সফরকালে তিনি তাঁর অভূতপূর্ব রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের দলিল বাংলাদেশকে অর্পণ করেন। এই দলিল হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ৪১ বছরব্যাপী ঝুলে থাকা সীমান্ত সমস্যার অবসান করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সীমান্তবাসী ফিরে পেয়েছেন তাদের মৌলিক অধিকার দেশের নাগরিকত্ব। বাংলাদেশ সফরকালে তিনি তাঁর চমৎকার বক্তব্য ও বাগ্মিতা দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মন জয় করেন। বঙ্গ অঞ্চলের মানুষের শান্তি, সমৃদ্ধি ও ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি তাঁর অন্তরের বিশেষ অনুভুতি ও ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে এগিয়ে যাবে’। নরেন্দ্র মোদীর এই ইচ্ছাটি বাক্য উচ্চারণে খুবই ছোট। কিন্তু এর অর্থ অনেক গভীর। দুই দেশের ভবিষ্যৎ ও ভাগ্য নির্ধারণী কথা। এটা একটি রাষ্ট্রীয় অন্তর্ভেদী অভিপ্রায়? এটা কোন নিছক আবেগের কথা নয়। দুটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রীয় বিশেষ বিষয়ে আবেগান্বিত কথা বলা যায় না। মূল কথার মধ্যে অবেগী কথা মিশ্রিত থাকে। প্রজ্ঞাবান রাজনীতিকরা বক্তব্যকে মধুময় ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য আবেগী ভাষা ব্যবহার করেন। দুই  দেশের দু’জন প্রধানমন্ত্রী, দুই দেশের স্বার্থরক্ষার রাষ্ট্রীয় কার্য্যে নিছক অবেগ-আপ্লুত কথা বলতে পারেন না। নরেন্দ্র মোদীর ওই কথার মধ্যেই নিহিত আছে সমগ্র বাঙালি জাতির ভাগ্য উন্নয়নের মূল বাধা উত্তরণের দর্শন।প্রশ্ন হলো, ভারত ও বাংলাদেশকে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে কেন? দুটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র কীভাবে একসঙ্গে এগিয়ে যাবে? যদি কোনভাবে একসঙ্গে এগিয়ে যায়, তাহলে প্রতিযোগীতা হবে কীভাবে? ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ওই কথার অর্ন্তনিহিত অর্থ কী? তিনি কী আশঙ্কা করেন যে, বাংলাদেশ অচীরেই একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে? বাংলাদেশ যদি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তাহলে ভারতের তাতে কী আসে-যায়? এতে ভারতের কী কোনো সমস্যা আছে? বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতের সমস্যা খুঁজতে গেলে দেখা যায় যে, ভারতের বিশেষ একটি সমস্যা আছে। ভারতের সমস্যা হলো, ‘ভারতের বাঙালি জনতা’। ভারতের বাংলাভাষী জনতা যদি বাংলাদেশের বাঙালিদের সাথে একমনে একপ্রাণে মিশে যায়! তারা যদি বর্ডার ভেঙ্গে এক হয়ে যায়! নরেন্দ্র মোদীর ওই বক্তব্যে প্রচ্ছন্নভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ভারতের এটা একটি মনস্তাত্ত্বিক ভাবনা। এ জন্যই হয়তো বা তিনি ভারত ও বাংলাদেশকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। যাতে ভারতের বাঙালি জনতা বাংলাদেশের বাঙালিদের সাথে একাকার হয়ে না যায়। উভয় দেশের বাঙালি জাতি যদি সমান তালে এগিয়ে যায়, তাহলে উভয় দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য অক্ষুন্ন থাকে। তাতে উভয় দেশের বাঙালিদের বর্ডার ভেঙ্গে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তারা এখন যেভাবে আছে, ভবিষ্যতেও সেভাবেই থাকবে।  ভারতের ওই মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার জন্য বাংলাদেশ কী উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে এককভাবে এগিয়ে যাবে না? ভারত তো এখনো তাদের জনগণকে জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে সক্ষম হয়নি। তাই বলে কী বাংলাদেশ তার নাগরিকদের পরিচয়পত্র দেবে না? বাংলাদেশের তো গভীর সমুদ্রে সোনাদিয়ায় ‘আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর’ গড়ে তোলার প্রকৃতিগত বিশেষ সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ভারতের তা নেই, তাই বলে কী বাংলাদেশ সমুদ্র বন্দর করবে না? এ ছাড়া বাংলাদেশের তো নিঝুম দীঁপে আন্তর্জাতিক শিল্পনগরী গড়ে তোলার অভূতপূর্ব সুযোগ আছে। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর এবং নিঝুম দীঁপে শিল্পনগরী গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর অন্যতম উন্নত ও ধনশালী  রাষ্ট্র। ভারত ও বাংলাদেশ এক সঙ্গে এগিয়ে যাবে, এই নীতিমালার কারণে কী বাংলাদেশ এককভাবে সমুদ্র বন্দর কিংবা শিল্পনগরী গড়ে তুলবে না? এ ক্ষেত্রে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ এককভাবেই সমুদ্র বন্দর এবং শিল্পনগরী গড়ে তুলবে। কিন্তু এতে ভারতের অকুন্ঠ সহযোগীতা প্রয়োজন হবে। কারণ শুধু সমুদ্র বন্দর গড়ে তুললেই হবে না, সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হবে স্থলবন্দর ও বিশাল সড়কপথ। এই সড়কপথ নির্মিত হচ্ছে। নির্মিতব্য এই সড়কের নাম ‘এশিয়ান হাই ওয়ে’। এশিয়ান হাই ওয়ে-কে বাংলাদেশের সাথে মিশতে হলে ভারতের সহযোগীতার প্রয়োজন হবে। এশিয়ান হাই ওয়ে ভারতের ভূখন্ডের উপর দিয়ে বাংলাদেশে আসবে। এই এশিয়ান হাই ওয়ে বাংলাদেশ থেকে চীনের কুম্বিং পর্যন্ত সড়কপথ সৃষ্টি করে দেবে। কিন্তু এই উন্নয়নের ওই স্বপ্নকে বাস্তবরূপ দিতে হলে বাংলাদেশের ৩টি বিশেষ বিষয়ে একমত হতে হবে। এক. ‘জাতীয় ঐক্য, দুই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তিন. সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূল’। জাতীয় ঐক্য না হলে, এককভাবে কোনো রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে পারবে না। আর রাজনৈতিক সংঘাত জিইয়ে রাখা হলে সব ভন্ডুল হয়ে যাবে। সুতরাং বাংলাদেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বাংলাদেশকে ওই তিনটি বিষয়ে সফলতা পেতে হলে ভারতের সহযোগীতার প্রয়োজন হবে। ভারতের সহযোগীতা পেলে বাংলাদেশ ওই তিনটি বিষয়ে সফলতা লাভ করতে পারবে।  বাংলাদেশ যদি একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয় তাহলে বঙ্গ অঞ্চলের সমগ্র বাঙালি জাতি এক হয়ে যাবে, এটা কোনো অমোঘ বাস্তবতা নয়, নিছক ভাবনা হতে পারে। তবে নরেন্দ্র মোদীর ‘ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে এগিয়ে যাবে’ এই বক্তব্যের মধ্যে ভারতের বাঙালি জনতা আর বাংলাদেশের বাঙালি জনতার একমনে একপ্রাণে মিশে যাওয়ার আশঙ্কার কিঞ্চিৎ ভাবনা থাকতে পারে। এ ভাবনা থেকে তিনি ‘ভারত-বাংলাদেশ এক সঙ্গে এগিয়ে যাবে’ এই বক্তব্য দিতে পারেন। তবে ওই বক্তব্য শুধু ওই ভাবনা থেকেই দিয়েছেন তা নয়। বঙ্গ অঞ্চলের সমগ্র বাঙালি জাতিসহ এশিয়া মহাদেশের সকল জনগণের জীবনমান উন্নয়নের চিন্তা-ভাবনা ওই বক্তব্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে। সোনাদিয়ায় সমুদ্র বন্দর ও নিঝুম দীপে শিল্পনগরী গড়ে তোলা হলে শুধু বাংলাদেশ লাভবান হবে তা নয়, চীন, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভূটান, মালদ্বীপসহ এশিয়ান রাষ্ট্রসমূহের জনগণ সমানভাবে লাভবান হবেন। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ওই সমদ্র বন্দর ও শিল্পনগরী বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। কারণ ওই বন্দর গড়ে তোলা হলে, এশিয়ান দেশগুলো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন অঞ্চল, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশসহ সারাবিশ্বের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যে তারা অস্বাভাবিক ব্যয় সাশ্রয় ও অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক লাভে লাভবান হবেন। সুতরাং সোনাদিয়ায় সমুদ্র বন্দর এবং নিঝুম দীপে শিল্পনগরী গড়ে তুলতে চীন ও ভারতকে বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে। তাদেরকে উদারচিত্তে সহায়তার হাত বারিয়ে দিতে হবে। কারণ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের জনগণ অভিভাবকশূন্য হয়ে গেছে। ‘ভারত-বাংলাদেশ এক সঙ্গে এগিয়ে যাবে’ নরেন্দ্র মোদীর এই বক্তব্য বঙ্গ অঞ্চলের মানুষের জন্য অভিভাবকসুলভ বক্তব্য বলেই আমার কাছে প্রতীয়মান হয়।