প্রচ্ছদ » Slider » গোটা খুলনা জুড়ে বৈশাখী উৎসবের আমেজ, চলছে শেষ প্রস্তুতি

গোটা খুলনা জুড়ে বৈশাখী উৎসবের আমেজ, চলছে শেষ প্রস্তুতি

Posted By:নিজস্ব প্রতিবেদক | Posted In:Slider,খুলনা,ফিচার,সাহিত্য ও সংস্কৃতি | Posted On:Apr 12, 2015

নূর হাসান জনি ।। খুলনা ::

একেবারে দোরগোড়ায় বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। বিত্ত-বৈভব, ধর্ম-বর্ণ সব ভেদাভেদ ভুলে বাঙালির শিকড়ের টান অনুভব করা আর নিজ সংস্কৃতির ইতিহাস সমৃদ্ধ করার উৎসব।

নববর্ষ নিয়ে আসবে বাঙালির জীবনে কল্যাণ, প্রাপ্তি এবং প্রেরণার অনুষঙ্গ। পহেলা বৈশাখ বরণ করার জন্য চলছে চারদিকে সাজগোজ ও ধোয়ামোছার প্রস্তুতি। নগরী জুড়ে চিত্রটা এখন উৎসবের আমেজে যেন বইছে। পুরাতন বছর ১৪২১ এর ঝরাজির্ণকে বিদায় জানিয়ে নতুনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে নববর্ষ ১৪২২ আয়োজনে ব্যস্ত নববর্ষ প্রেমীরা। এখন শুধু সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় রয়েছে সবাই। তবে বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখের অন্যতম প্রধান অনুসঙ্গ হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে মুখোশ। খুলনায় পহেলা বৈশাখের অন্যতম আয়োজন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা। আর এই শোভাযাত্রাকে মুখোশ ছাড়া যেন কল্পনাই করা যায় না। বরাবরের মত এবারও নববর্ষকে সামনে রেখে মুখোশ তৈরির ধুম লেগেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। বাহারি রঙের হরেকরকম মুখোশ তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিক্ষার্থীরা। কেউ কাটছেন নির্দিষ্ট মাপ ও সাইজের কাগজ, কেউ তাতে কাঠামো দিচ্ছেন। মুখোশে রং করছেন কয়েকজন, কেউ আবার রঙ মেশাচ্ছেন।

এবারও বর্ষবরণে নগর জুড়ে চলছে নানা আয়োজন। মহানগরী খুলনার সরকারী ভাবে অনুষ্ঠান ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আয়োজন করেছে নানা অনুষ্ঠানমালার। নগরীর শহীদ হাদিস পার্ক, জিয়া হলসহ বিভিন্নস্থানে বৈশাখী মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চল খালিশপুরে এবার ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে। সম্প্রীতির বন্ধন পার্কের মোড় এর ব্যানারে খালিশপুরস্থ ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক মোড়ে ১লা বৈশাখকে ঘিরে ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ১লা বৈশাখ সকাল ৮টায় শোভাযাত্রা ও এর সাথে শিশুদের যেমন খুশি তেমন সাজো। শুরু হবে সকাল ৮টায়। পান্তা ইলিশ ভোজন সকাল সাড়ে ৯টায়। শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা বেলা ১১টায়। গৃহিনীদের পিঠা প্রতিযোগিতা বেলা ১১টায়। স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচী বেলা সাড়ে ১১টায়। দিনব্যাপী গরীবদের মাঝে বিনা মূল্যে চিকিৎসা প্রদান দুপুর ১টায়। (খালিশপুর পার্কের মোড় থেকে শুরু হয়ে মহানগরী খুলনা প্রদক্ষিণ শেখে পার্কের মোড়ে শেষ হবে)। দুঃস্থদের মাঝে অনুদান প্রদান, পুরস্কার বিতরণী, অতিথিদের সম্মাননা প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ওয়ান্ডারল্যান্ড শিশু পার্কের ভিতরে। পার্কের মোড়ে আয়োজন সম্পর্কে অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী আকাশ আহমেদ বলেন, নতুন প্রজন্মের মাঝে বাঙালীর চিরায়াত ঐতিহ্য ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে বরাবরের ন্যায় আমরা আয়োজন করেছি এ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার। তিনি অনুষ্ঠানকে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি আরো জানান, এবারের শোভাযাত্রায় স্থান পাচ্ছে রয়েলবেঙ্গল টাইগার, ময়ূর, প্যাঁচা, কুমির,পালকি সাপসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতির আদলে মুখোশ। এছাড়া খালিশপুর নয়াবাটি মোড়স্থ বন্ধু মহল ক্রীড়া সাংস্কৃতিক সংসদ ও পাঠাগারের আয়োজনে দু’দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানমালা অনুষ্ঠিত হবে। ১ বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) সকালে শোভাযাত্রা ও ৩ বৈশাখ (১৬ এপ্রিল) বিশিষ্ট ব্যক্তির সম্মাননা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে। অন্যদিকে জেলার সকল উপজেলা পরিষদও নতুন বর্ষ বরনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ উপলক্ষে নিচ্ছেন ব্যাপক প্রস্তুতি। সব বয়সের মানুষ তার মনের মতো করে বরণ করতে চায় বাংলার এই আগমনী বার্তা ও নতুন সুরকে। আর এই উচ্ছ্বাস তরুণ-তরুণিদের মনে একটু বেশি কাজ করছে। সরেজমিনে গিয়ে জানাযায়, বর্ষবরণের জন্য এবারও আগে থেকেই ভিড় জমাচ্ছে নগরীর বিভিন্ন মার্কেট ও শপিংমলে সকল বয়সের মানুষ। প্রিয়  সব জিনিস কিনে নিতে ব্যস্ত সবাই। বৈশাখে সাধরণত বাঙালি নারীরা লাল-সাদা রংয়ের শাড়ি ও থ্রীপিছ আর পুরুষেরা লাল-সাদা রংয়ের পাঞ্জাবি কিংবা ফতুয়া বেশি পরে থাকে। এখানেই শেষ নয় পরিহিত পোশাকের সাথে মিলিয়ে ছেলেদের তেমন কিছু না থাকলেও মেয়েদের যেন শেষ নেই। হাতের চুড়ি, কানের দুল কিংবা নাক ফুল সবই তার সাদা কিংবা লাল হওয়া চাই। অন্যথায় এই দোকান রেখে ছুট অন্য দোকানে। কখনো এই মার্কেট রেখে ছুট অন্য মার্কেটে।এছাড়াও প্রসাধনীর আরো অন্যান্য সামগ্রিতো আছেই। শাড়ি ও সাধারণ থ্রি-পিসে চুড়িদার বা পাজামা শুধু নয়, সিঙ্গেল কামিজ ও ফতুয়ার সঙ্গে এবার পাঞ্জাবি, ধুতি, লেগিংস বিক্রি বেড়েছে। বাহারি ওড়না মিলিয়ে যে কারও সাচ্ছন্দ্যের অনুষঙ্গ হবে এগুলো। স্কার্ট দেবে গরমে আরাম।  এবারের বৈশাখে বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরাই দেখাবেন এমন ফিউশন। ছেলেরা পাঞ্জাবী, ফতুয়া-কাতুয়ার পাশাপাশি টি-শার্টও নিচ্ছেন। প্যান্ট, পাজামার যেমন বিক্রি চলছে, ধুতিও নিচ্ছেন কেউ কেউ, সঙ্গে নিচ্ছেন গামছা, পছন্দ করছেন কোটিও । বৈশাখী কালেকশনে সুতি কাপড়ের প্রাধান্য থাকছে এবারও। কটনের মধ্যেই কিছু মিশ্রণ দিয়ে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে।  আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে পরতেই সুতিটা নিতে চান সবাই।

বছরের সব সময় না হলেও বিভিন্ন উৎসবের সময় তাদের স্বস্তি নেই। তার মধ্যে এই বর্ষবরণ অন্যতম। নগরীর বিভিন্ন মার্কেটে গিয়ে আরো দেখা গেছে বর্ষবরণের তরুণ-তরুণিদের প্রস্তুতির নানান কর্মকাণ্ড ও কেনাকাটর দৃশ্য। কেনাকাটার বিষয় নিয়ে কথা বলারও সময় পাচ্ছেন না বিক্রেতারা।

বৈরি আবহাওয়াও দমিয়ে রাখতে পারেনি তরুণ-তরুণিদের বর্ষবরণের প্রস্তুতি। অনেকেই এসেছিলেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে। নিউমার্কেট, রব শপিং কমপ্লেক্স, সেভ এন সেভ, মীনা বাজার, জলিল মার্কেট, খুলনা শপিং মল, বাটিক্স এর দোকান ঘুলিতে মোটামুটি ভিড়। বিকেল হওয়ার সাথে সাথে একদিকে বেড়েছে ক্রেতাদের সংখ্যা অন্যদিকে বেড়েছে বিক্রিও। ব্যবসায়ীরা দোকানের পাশাপাশি চলছে হালখাতার প্রস্তুতি। ব্যবসায়ী মহলে হালখাতা অনুষ্ঠান মানে নতুন অর্থবছরের হিসাব খোলা। নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে লাল মলাটের খাতায় হিসাব খুলে নবউদ্যমে শুরু করা হয় ব্যবসা। সেখানে অতীতের ভুলভ্রান্তিগুলো পর্যালোচনা করে হালখাতা থেকে নেওয়া হয় নতুন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি। হালখাতা একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ বর্তমানকাল। এখনও ঐতিহ্য হিসেবে হালখাতা অনুষ্ঠান করে থাকেন স্বর্ণ ও কাপড় ব্যবসায়ীরা। পহেলা বৈশাখে নগর ব্যবসায়ীরা তাদের নিয়মিত পরিচিত ক্রেতাদের আগে থেকেই সুদৃশ্য লালকার্ড বা আকর্ষণীয় একটি কার্ডের মাধ্যমে নিমন্ত্রণ করেন। নববর্ষের দিনে মিষ্টি-মণ্ডা দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করা হয়। আমন্ত্রিত ক্রেতারা নতুন কোনো পণ্য কিনে শুভেচ্ছাস্বরূপ হালখাতায় হিসাব খোলেন। নয়তো পুরনো পাওনা শোধ দিয়ে নতুন খাতায় নাম লেখান।

বৈশাখ মানেই বাঙালি নারীর পরনে লাল পাড় সাদা শাড়ি। অন্য রঙ আসতে পারে সহযোগী হিসেবে কিন্তু বৈশাখের মূল রঙই হচ্ছে লাল। মূল্যহ্রাস ও ছাড়ে’র ব্যবস্থা করে পোশাক বিক্রেতারা গত মৌসুমের ডিজাইনকে বিদায় জানাচ্ছেন। দু’একদিনের মধ্যেই সাজাতে হবে দোকানকে বৈশাখী সাজে। শুধু পোশাক নয়, ব্যবসায়ীরা পুরো দোকানটাকেই সাজাবেন নতুন রঙ ও আঙ্গিকে।

এছাড়া বৈশাখের পোশাক কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নগরীর তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে ছোট এবং বড়রাও। এই দিনে নিজেকে একটু ভিন্নভাবে রাঙাতে সবাই ব্যস্ত। বিক্রেতারা তাদের পণ্যটি বিক্রি করতে আর ক্রেতারা কিনতে এই করে কখন সকাল পেরিয়ে দুপুর কিংবা রাত্রি হচ্ছে তা দেখারও সময় নেই। কেননা ওই যে দেখা যায় নতুন বছরের হাতছানি! বৈশাখ এলো বলে।