প্রচ্ছদ » Slider » এ রাজনীতি দেশের জন্য নাকি নিজের জন্য ?

এ রাজনীতি দেশের জন্য নাকি নিজের জন্য ?

Posted By:নিজস্ব প্রতিবেদক | Posted In:Slider,জাতীয়,বাংলাদেশ,মুক্ত মত,রাজনীতি | Posted On:Jan 20, 2015

নিজস্ব প্রতিবেদক      ।।    টুডেবার্তা     ।।

বিএনপি-জামায়াতসহ ২০-দলীয় জোটের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধে উত্তরের কৃষক-শ্রমিকদের মরণদশা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ পোড়ানো, গাড়িতে আগুন দেওয়াসহ বিভিন্ন নাশকতা-নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। এই বিপর্যয় ঠোকাতে ‘জাগো রংপুর’ নামের একটি সংগঠন সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটিতে রংপুরের শান্তিকামী সচেতন ব্যক্তিরা যুক্ত আছেন। এটি শহরে পদযাত্রাও করেছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে অনেক বড় সমাবেশের।

একটি প্রস্তুতি সভায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সাখাওয়াত রাঙ্গা অবরোধে-হরতালে তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। গত বছরের টানা হরতাল-অবরোধে সৃষ্ট জানজটে ১০ ঘণ্টা তিনি আটকা পড়েছিলেন বগুড়ায়। সামনে ছিল নীরব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘পাকিস্তান কত দূর? এ প্রশ্নের কেউ কোনো জবাব দেননি।সত্যিই কি আমরা জামায়াত চক্রে পড়ে পাকিস্তানের কাছাকাছি এসেছি? গত বছরের চিত্র দেখে একাত্তরের বগুড়ার এক শহীদের স্ত্রী বলেছিলেন, একাত্তরের মতো আতঙ্ক মনে হয়।

দেশব্যাপী আবারও তো সেই আতঙ্কই তৈরি হচ্ছে। আবারও মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। দেশের এ পরিস্থিতি নিয়ে কথা হচ্ছিল পীরগাছা খন্দকার আবদুল করিম মিয়া বি এম কলেজের অধ্যক্ষ কে এম ফখরুল আনামের সঙ্গে। পাকিস্তান কত দূর প্রসঙ্গ আসতেই তিনি বলছিলেন, পাকিস্তান মিঠাপুকুর পর্যন্ত এসেছে।মিঠাপুকুর জামায়াতে ইসলামীর শক্ত ঘাঁটি। সেখানে ১৩ তারিখ মধ্যরাতে চলন্ত বাসে পেট্রলবোমায় পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন পাঁচজন। তাঁদের মধ্যে বেঁচে যাওয়া রাজমিস্ত্রি রংপুর বার্ন ইউনিটে দগ্ধ আনোয়ার হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, হাসিনা, খালেদা তো বসি বসি দ্যাখে।

তাঁদের তো কিছু হয় না। হামরা স্বাধীন দেশোত স্বাধীনভাবে কাজ করি খাবার চাই। সেদিন মধ্যরাতের অভিজ্ঞতার কথা জানান এভাবে, প্রশাসন সঙ্গে ছিল, সেই সাহসে গাড়িতে উঠছিলেন। সে কথা ভাবলে এখনো কান্না আসে। জানালা দিয়ে লাফিয়ে নেমে দেখেন আগুন আর আগুন। যাঁরা মারা গেলেন, তাঁদের মা-বাবা তো আর তাঁদের ফিরে পাবেন না। বলতে বলতে তাঁর চোখ জলে ছলছল করে ওঠে।গত শুক্রবার বিকেলে রংপুরের পার্ক মোড় এলাকায় ৬০ জন যাত্রী কিশোরগঞ্জ যাওয়ার জন্য বাসের অপেমক্ষা করছিলেন। সঙ্গে নিয়েছেন মাটি কাটার উপকরণ।

হরতাল-অবরোধে কেন তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাচ্ছেন জানতে চাইলে ফারুক নামের একজন বললেন, জীবন বাঁচাতেই জীবনের ঝুঁকি। তিন ছেলে। ১২ কিলোমিটার দূরের একটি কলেজে এক ছেলে পড়ে। তার সাইকেলের একটি টায়ার কিনতে পারিনি তিন মাস ধরে। এক মাস ধরে কাজ নেই। ঘরে অভাব, পথে বিপদ। আল্লাহর ওপর ভরসা করে যাচ্ছি। দোয়া করবেন।দেশব্যাপী অবরোধ-হরতালে জনজীবন বিপন্ন-বিপর্যস্ত। পৈশাচিক ও বর্বরের ভূমিকায় শত্রুরা অবতীর্ণ হয়েছে। মানুষকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, তবু রাজনীতিকদের হৃদয় পোড়ে না।

মৃতের সারি দীর্ঘ হলেও তাঁদের বিবেকে কোনো শুভ চিন্তার উদয় হচ্ছে না। সরকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতেও ব্যর্থ। রাজনীতি মানুষের কল্যাণে, নাকি মানুষ হত্যার করাতকল, তা-ই যেন এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু রাজনীতিকদের কাছে অনুরোধ, নিজেদের স্বার্থে নয়, সাধারণ মানুষের পক্ষের রাজনীতি করুন।কয়েক দিন আগে অবরোধে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে রংপুর জাহাজ কোম্পানির মোড় থেকে এক সহকর্মীসহ রাত ১০টায় লালবাগ ফিরছিলাম। রানা নামের এক যাত্রী নিজের মনেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রতি।

ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা তিনি। তাঁর মা অসুস্থ হওয়ায় এসেছিলেন নীলফামারীতে। কর্মস্থলে ফেরার জন্য ট্রেনের টিকিটও করেছিলেন, কিন্তু সেই ট্রেন আসতে ১৮ ঘণ্টা বিলম্ব হবে। অননুমোদিত ছুটি এক দিন হয়েছে। ঘন কুয়াশার রাতে জীবন বিপন্ন হওয়ার সব ঝুঁকি নিয়ে তিনি তাই রওনা দিয়েছেন সড়কপথেই।অবরোধ শুরুর অনেক দিন আগেই কথা দিয়েছিলাম কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকব। অবরোধে দেশের অবস্থা এ রকম হবে আগে বুঝিনি। আয়োজকেরা প্রস্তুতি নেওয়ার কারণে ৭০ কিলোমিটার রাস্তা অটোরিকশায় যেতে হলো, আবার ফিরতে হলো।

মহাসড়ক ধরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ, বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব মহাসড়ক অবরোধ করে পথেই রান্নার ব্যবস্থা করেছেন। একই অটোরিকশায় নোয়াখালী থেকে বাড়ি ফেরার এক যাত্রীও উঠেছেন। কীভাবে তিনি এলেন জিজ্ঞাসা করতেই বিস্ময়কর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে একে একে বলতে লাগলেন কতগুলো গাড়ি তিনি বদলাতে বদলাতে দুদিনে এসেছেন। রাস্তা কার্পেটিংয়ের কাজ করেন তিনি। অবরোধে ইঞ্জিনিয়ার আসেন না, সে জন্য সড়ক কার্পেটিংয়ের কাজ হয় না। তাই বাড়ি এসেছেন। হরতাল-অবরোধ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এইগুলার দরকার আছিল না। এলা তো হামরা ভালোই আছি। ছাওয়াক স্কুলোত দিছি, হামরা কাম করি। হরতাল দিলে পোষায় না।

একজন সরকারি কর্মকর্তা গিয়েছিলেন চট্টগ্রামে নিজের বাড়িতে। রংপুর ফেরার আর কোনো উপায়ই পাচ্ছিলেন না। সন্তানদের স্কুল শুরু হয়েছে। শেষে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ইজতেমার ব্যানার গাড়ির সামনে বেঁধে প্রায় ৩০ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম থেকে রংপুর এসেছেন। বন্ধু সাংবাদিক কেরামত উল্লাহ বিপ্লবের স্ত্রী-সন্তান রংপুরের পীরগঞ্জে গিয়ে অবরোধে আটকা পড়েছে। এ প্রসঙ্গে তাঁর ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসের অংশবিশেষ, প্রতিদিন মোবাইল ফোনে এসএমএস আসছে আপনার সন্তান স্কুলে অনুপস্থিত। আমি চিন্তায় কাহিল। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় তারা ক্লাসে অনুপস্থিত। ট্রেনে নাকি তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। সৈয়দপুর থেকে বিমান আছে।

তিন হাজার টাকার ভাড়া এখন ছয় হাজার টাকা। গ্রামের বাড়ি থেকে সৈয়দপুরও প্রায় দুই ঘণ্টা মহাসড়ক পথ। সেটা কি নিরাপদ? অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের আনতে গিয়ে জানলাম ভাড়া ২৫ হাজার টাকার বেশি। কী যে করি…

তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।